রাজধানী
Trending

ঢাকায় আগের মতোই যানজট বিশেষ’ ব্যবস্থাতেও

প্রতিবছর পবিত্র রমজান মাসে রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে ‘বিশেষ’ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। রমজান মাসের প্রায় শুরু থেকেই রাজধানীর বেশির ভাগ সড়কে তীব্র যানজট হচ্ছে। বিশেষ করে ইফতারের আগের তিন ঘণ্টা অনেক এলাকার সড়ক যানজটে স্থবির হয়ে পড়ছে।

স্বয়ংক্রিয় কোনো সংকেতব্যবস্থা না থাকায় ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা হাতের ইশারায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। অথচ রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিকায়নের জন্য গত দুই দশকে চারটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে।

এবার রোজা শুরুর আগের দিন ১১ মার্চ ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘রমজানে মানুষজন যেন বাসায় গিয়ে প্রিয়জনের সঙ্গে ইফতার করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি ডিএমপির অপরাধ বিভাগগুলোও কাজ করবে। বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত আমাদের বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। একই সময়ে রাস্তায় বেশি পুলিশ মোতায়েন রাখা হবে, যাতে করে মানুষ ঘরে গিয়ে ইফতার করতে পারেন।’ তিনি আরও বলেছিলেন, রমজান মাসে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দুপুরের পর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানজটের তীব্রতা বাড়তে থাকে। বিকেলের দিকে, বিশেষ করে অফিস ছুটির পর যানজট পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে গাড়ি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশেরও যেন করার কিছু থাকে না।

যানজট পরিস্থিতিসহ ট্রাফিক–সংক্রান্ত নানা ধরনের তথ্য আদান-প্রদানের জন্য ‘ট্রাফিক অ্যালার্ট’ নামে ফেসবুকভিত্তিক একটি গ্রুপ রয়েছে। এই গ্রুপে রমজানের শুরু থেকেই অনেকে তাঁদের ভোগান্তি-ক্ষোভের কথা জানাচ্ছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে মো. সুজন নামের একজন লেখেন, বাসে করে কলেজ গেট থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর যেতে তাঁর সময় লেগেছে ৪৫ মিনিট। এই পথের দূরত্ব তিন কিলোমিটারের কম। সামাইরা স্বর্ণা নামের আরেকজন লিখেছেন, তিনি গতকাল দুপুরে বিজয় সরণি সিগন্যালে আটকে ছিলেন প্রায় ৪০ মিনিট।

গত বুধবার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি অংশের র‍্যাম্প (নামার রাস্তা) খুলে দেওয়া হয়। এই র‍্যাম্প খোলার পর থেকে কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, মগবাজার ও আশপাশের এলাকায় যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। র‍্যাম্পের নামার মুখ থেকে আশপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার পর্যন্ত যানজট ছড়িয়ে পড়ছে। র‍্যাম্প থেকে নামতেও দীর্ঘ সময় লাগছে।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে করে মাত্র ১৫ মিনিটে উত্তরা থেকে এফডিসি র‍্যাম্পে নামার মুখে আটকা পড়েন প্রাইভেটকার চালক মো. বাবুল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এই র‍্যাম্প থেকে নেমে সোনারগাঁও ক্রসিং ঘুরে কারওয়ান বাজার (কিচেন মার্কেটের সামনে) পৌঁছাতে তাঁর সময় লেগেছে প্রায় ৫০ মিনিট।

বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর হিসেবে পরিচিতি পাওয়া রাজধানী ঢাকায় যানবাহনের গতি এই রমজান মাসে যেন আরও ধীর হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের সর্বশেষ (গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫২টি দেশের ১ হাজার ২০০টির বেশি শহরের মধ্যে সবচেয়ে ধীরগতির শহর ঢাকা।

বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটও রাজধানীর যানজট পরিস্থিতি নিয়ে ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে রাজধানীর সড়কে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। ২০২২ সালে তা কমে হয় ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। অর্থাৎ দেড় দশকে রাজধানীতে যানবাহন চলাচলের গতি কমেছে ঘণ্টায় ১৬ কিলোমিটারের মতো।

ইফতারের আগে যানজট তীব্র
রমজানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ইফতারের আগের সময়ে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিল পুলিশ। ট্রাফিক বিভাগের পাশাপাশি পুলিশের অপরাধ বিভাগের সদস্যরাও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছেন। তবে রাজধানীর সড়কে ইফতারের আগের তিন ঘণ্টায় যানজট তীব্র হচ্ছে। ঈদের আগে কেনাকাটার জন্য বিপণিবিতানগুলোতে ভিড় বাড়বে। ফলে আগামী কয়েক দিনে যানজট পরিস্থিতি আরও বাড়তে পারে।

গত ১০ দিনের যানজট পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাফিক বিভাগ গতকাল ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের নিজেদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে। ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান বলেন, রমজান মাসে অফিস সময় ভিন্ন হয়। সবাই বিকেল সাড়ে পাঁচটা-ছয়টার মধ্যে ঘরে ফিরতে চান। ফলে ওই সময়ে যানবাহনের চাপ বাড়ে। আবার বিভিন্ন বাস টার্মিনালের সামনে একাধিক বাস আড়াআড়ি রাখার কারণেও যানজট হচ্ছে। ট্রাফিক সিগন্যাল না মেনে পথচারীরা সড়ক পারাপার হচ্ছেন, ফলে যানবাহন চলাচল ধীর হচ্ছে। যেসব বড় বাসস্ট্যান্ডে আড়াআড়ি বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে, সেগুলোতে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ১৮টি সংস্থা সম্পৃক্ত জানিয়ে মুনিবুর রহমান বলেন, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ তার মধ্যে মাত্র একটি, বাকি ১৭টি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। এখন বিভিন্ন সড়কে সংস্কার ও মেরামতের কাজ দৃশ্যমান। জনগণের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে এসব সড়ক সাময়িক চলাচল উপযোগী করে দিতে বিভিন্ন সংস্থাকে ট্রাফিকের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

হাতের ইশারাই ভরসা
রাজধানীতে এখন পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় কোনো সংকেতব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হয়নি। পুরো শহরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের হাতের ইশারায়। আধুনিক ট্রাফিক সংকেত ব্যবস্থা চালু করতে গত দুই দশকে চারটি প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহার না হওয়ায় অধিকাংশ বাতি অকেজো হয়ে গেছে।

সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০১০-১১ অর্থবছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯২টি মোড় বা ইন্টারসেকশনে সোলার প্যানেল, টাইমার কাউন্টডাউন (সময় গণনার যন্ত্র), কন্ট্রোলার (নিয়ন্ত্রক) ও কেবল (তার) স্থাপন করা হয়। এই স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল-ব্যবস্থা এখন অকার্যকর। ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোনো জায়গাতেই সংকেতবাতি জ্বলে না। কিছু জায়গায় সংকেতবাতি নষ্ট হয়ে ঝুলে আছে। ট্রাফিক পুলিশ কিংবা চালক—কেউ ফিরেও এসব বাতির দিকে তাকান না। হাতের ইশারাতেই যানবাহন চলছে আর থামছে।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের দেশকাঁপানো আন্দোলনের পর ঢাকার ট্রাফিক-ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি কমিটি করা হয়েছিল। ওই কমিটি একাধিক সভা করার পর বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়। এর মধ্যে আধুনিক সংকেতব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও ছিল। তবে গত পাঁচ বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজধানীতে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সংকেতব্যবস্থা চালুর নির্দেশনা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশনার পর ঢাকায় ট্রাফিক সংকেত চালুতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মুনিবুর রহমান বলেন, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে রাজধানীর ১১০টি ট্রাফিক সিগন্যালের মধ্যে গুলশান–২ নম্বরে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ডিএমপি, বিআরটিএ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এই চার সংস্থাকে নিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য একাধিক সভা হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্য স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে।

আধুনিক সংকেতব্যবস্থা না থাকায় সড়কের প্রতিটি মোড় ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় পথচারীদের। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পথচারীরা চলেন যানবাহনের ফাঁক গলে। পথচারীবান্ধব আধুনিক পারাপারের ব্যবস্থা করা গেলে মানুষ নিজ গরজেই নিরাপদ পথ ধরে চলবেন।

স্বয়ংক্রিয় সংকেতব্যবস্থা কার্যকর না থাকার বিষয়টি সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার অন্যতম উদাহরণ বলে মনে করেন বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর রমজান মাসে যানজট পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এর কারণ ট্রাফিক বিভাগের যানজট নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা দুর্বল। রমজান মাসে সড়কে গাড়ির চাপ বাড়ে, ফুটপাত আরও বেশি দখল হয়ে যায়। এসব বিষয় মাথায় রেখে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা কতটা নেওয়া হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button